ধানের চারা রোপন যন্ত্র
26 January, 2025
5 mins min read
Bangla
- Description
ধানের চারা রোপন যন্ত্র
ধান চাষে চারা রোপনের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংকট একটি একটি বড় ধরনের সমস্যা। যন্ত্রের সাহায্যে কম খরচে ও সঠিক সময়ে ধানের চারা রোপণ করা যায়। ধানের চারা রোপনের যন্ত্র ব্যবহার করলে একাধারে শ্রমিক সংকট মোকাবেলা ও সঠিক সময়ে ধান চাষ করা সম্ভব। বাংলাদেশে ধান চাষের জন্য জমি চাষ করে ও জমি চাষ বিহীন ভাবে যন্ত্রের সাহায্যে ধানের চারা রোপণ করা সম্ভব। চাষ বিহীন ভাবে জমিতে যন্ত্রের মাধ্যমে ধানের চারা রোপণ করলে পানির সাশ্রয় হয়, উৎপাদন বিঘ্নিত হয় না ও জমির উর্বরতা সংরক্ষিত হয়। যন্ত্রের মাধ্যমে চারা রোপণের জন্য ধানের চারা বিশেষ পদ্ধতিতে ট্রে বা পলিথিনের ম্যাটে প্রস্তুত করতে হয়, যা উপযুক্ত সময়ে যন্ত্রের মাধ্যমে জমিতে রোপণ করা যায়।
ধানের চারা রোপণ যন্ত্র ব্যবহারের উদ্দেশ্য:
- ধানের চারা রোপণ করতে খরচ সাশ্রয় হয়
- ধানের চারা রোপণ করতে কম শ্রমিক প্রয়োজন হয়
- ধানের চারা রোপণ করতে কম সময় প্রয়োজন হয়
- ধান রোপণের সময় কমিয়ে পরবর্তী ফসলের জন্য সময়মত বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণ করে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা যায় ধানের চারা রোপণ যন্ত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা
- যন্ত্রটি তুলনামুলকভাবে আকারে ছোট
- হালকা ও সহজে এক জমি থেকে অন্য জমিতে স্থানান্তরিত করা যায়
- সহজেই চালানো যায়
- পরিচালনা ও মেরামত খরচ কম
- ধানের চারা রোপণ যন্ত্র সহজেই কিনতে পাওয়া যায় যন্ত্রের মাধ্যমে ধানের চারা রোপণ ট্রে বা পলিথিনের ম্যাটে নির্ধারিত উপায়ে প্রস্তুতকৃত ধানের চারা যন্ত্রের মাধ্যমে জমিতে রোপন করা হয়। সনাতন পদ্ধতিতে যেখানে এক একরে ধানের চারা বীজতলা থেকে উত্তোলন ও সারিবদ্ধ ভাবে রোপণ করতে ১৮ থেকে ২০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয় সেখানে একটি ধানের চারা রোপণ যন্ত্রের মাধ্যমে মাত্র একজন চালক ও দুইজন শ্রমিক মিলে দিনে প্রায় চার একর জমিতে ধানের চারা রোপণ করতে পারে। প্রতি একরে জ্বালানী খরচ মাত্র ১.৫ থেকে ১.৮ লিটার পেট্রোল। যন্ত্রের দ্বারা ধানের চারা রোপনের সুবিধা
- ১৫ থেকে ৩০ দিন বয়সের চারা রোপণ করা যায়
- সারি থেকে সারির দুরত্ব সঠিক থাকে এবং চারা থেকে চারার দুরত্বও এক সমান থাকে
- ধানের ফলন সনাতন পদ্ধতি থেকে বেশি হয়
- চারা রোপণের সময় চারা কম আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং চারা সঠিক ও সমভাবে জমিতে বেড়ে ওঠে
- কৃষকদের জন্য শ্রম সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়
- জমিতে চারা রোপণ করতে কম সময় প্রয়োজন হয়
- জমিতে চারা রোপণ করতে কম শ্রমিক প্রয়োজন হয়
- শ্রমিক স্বল্পতার সমস্যা লাঘব করে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করে
- বীজতলা তৈরী ও চারা উৎপাদন
- ভালো মানের বীজ সংগ্রহ করতে হবে। বীজের অংকুরোদগম হার শতকরা ৯০% এর অধিক হওয়া প্রয়োজন। সঠিকভাবে যন্ত্রের উপযোগী চারা উৎপাদনের জন্য এটি জরুরি।
- প্রথমে বীজকে রোদে ৩০ মিনিট ধরে রেখে শুকাতে হবে। এরপর বীজ ঠান্ডা করে পরিষ্কার পানিতে ডুবিয়ে উপরে ভাসমান চিটা ধানসহ সকল প্রকার ভাসমান পদার্থ হাত দিয়ে তুলে ফেলে দিতে হবে
- এরপর ধান বীজকে নির্দেশিত মাত্রায় কার্বনডাজিম দ্রবনে ২৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে।
- ছত্রাকনাশক দিয়ে শোধনের পর বীজকে ধুয়ে ব্যাগে বা বস্তায় ভরে জাগ দিতে হবে
- ৪৮ ঘন্টা সময় পর অংকুরিত বীজকে ট্রে বা ম্যাটে স্থাপন করতে হবে
- বীজতলার জন্য মাটি তৈরী
- বীজতলার জন্য গুড়া করা মাটি বা কাদা মাটি উভয়ই ব্যবহার করা যায়। গুড়া মাটির জন্য জমি হতে মাটি সংগ্রহ করে তা পিটিয়ে গুড়া করে চালুনি দিয়ে চেলে নিতে হবে যেনো কোন ইট, পাথর বা অনা কোন বস্তুর অংশ না থাকে। প্রয়োজন মতো এর সাথে জৈবসার মিশ্রিত করা যেতে পারে। কাদা মাটির জন্য জমি হতে কাদা তুলে তা ব্যবহার করা যায় তবে লক্ষ্য রাখতে হবে তাতে যেনো কোন ইট, পাথর বা অন্য কোন শক্ত পদার্থ না থাকে।
- ট্রে তে বীজতলা তৈরী
- বাজারে প্লাস্টিক ট্রে কিনতে পাওয়া যায় যার মাপ ০.৫৮ মি x ০.২৭ মি., এই ট্রেতে চিত্রে প্রদর্শিত উপায়ে হাত দিয়ে মাটি ভরাট করে বীজ বপণের উপযোগী করা হয়। এখানে একট স্কেল বা বাঁশের লম্বা ফালির মাধ্যমে হাত দিয়ে টেনে মাটিতে ট্রের উপরে সমান করা হয়।
- পলিথিনের ম্যাটে বীজতলা তৈরী
- পলিথিনের ম্যাটে বীজতলা তৈরী করার জন্য প্রথমে যেখানে বীজতলা করা হবে সেখানকার মাটি সমান করে নিতে হবে। এর পর সেখানে পলিথিন বিছিয়ে তার উপর গুড়া করা ঘাটি দিতে হবে ২ থেকে ২.৫ সে. মি পুরু করে গুড়া মাটির পরিবর্তে কাঁদা মাটিও ব্যবহার করা যায়। মাটির অবস্থান ঠিক রাখতে এর চারপাশে কাঠ বা বাঁশের অংশ দিয়ে সমান করে নিতে হবে। কোন সুক্ষ প্রান্ত বিশিষ্ট বস্তু দ্বারা কিছুটা দূরত্ব রেখে পলিথিন ছিদ্র করে দিতে হবে যাতে পানি নিষ্কাশন সহজ হয়। এর পর মাটিকে সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে সবজায়গায় মাটির পুরুত্ব সমান থাকে ট্রেতে বীজতলা তৈরীর তুলনায় ম্যাটে বীজতলা তৈরী করা কম খরচ সাপেক্ষ এবং সহজেই বীজতলা তৈরী করা যায়।
- বীজতলাতে বীজের হার
- প্রতিটি ট্রেতে ১২০ থেকে ১৪০ গ্রাম হারে বীজ দিতে হবে। এই বীজ হাত দিয়ে সবজায়গায় সমান ভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে, কোথাও বেশী ঘন আরার 'কোথাও ফাঁকা যেনো না-থাকে।
- বীজতলার রক্ষণাবেক্ষণ
- বীজতলাকে পাখি ও অন্যান্য প্রাণি থেকে রক্ষা করতে চারদিক জাল দিয়ে ঘিরে দিতে হবে। এছাড়াও প্রথম ৪/৫ দিন নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে এবং লক্ষ্য রাখতে হবে যেনো কোন অবস্থায়ই বীজতলা পানির অভাবে শুকিয়ে না যায়। যেহেতু অধিক তাপ ও অধিক শৈত্য উভয়ই বীজতলার জন্য ক্ষতিকর তাই বীজতলাকে অধিক তাপ থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় সেচের ব্যবস্থা করতে হবে ও শীতের সময় কুয়াশা থেকে রক্ষা করতে বীজতলাকে সন্ধ্যায় পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হয়ে ও সকালে পলিথিন সরিয়ে দিতে হবে। অধিক বৃষ্টিতেও বীজতলাতে উপযুক্ত ছাউনী দিতে হবে।
- ধানের চারা রোপণ যন্ত্র চালনা
- ধানের চারা রোপণ যন্ত্রের চালনা গিয়ার অংশে দুটি ভাগ আছে। একটি জমিতে নিয়ে যাবার জন্য অপরটি জমিতে ধানের চারা রোপণের জন্য। যন্ত্রটির নিচে নৌকার মতো ভাসমান অংশ আছে যাকে ফোট বলে এবং এর মাধ্যমে যন্ত্রটি কাঁদাতে ভেসে থাকে। রাস্তায় চলবার সময় বা উঁচু আইল পার হবার সময় এই ফ্লোটকে হাইড্রোলিক ব্যবস্থার মাধ্যমে উঠানামা করা যায়। জমিতে চারা রোপনের সময় চারা কতটুকু গভীরে রোপিত হবে, চারা থেকে চারার দুরত্ব কতটুকু হবে এবং প্রতি গোছাতে কতগুলো চারা থাকবে তা নির্ধারণ করার জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রক লিভার বা পদ্ধতি আছে। নির্ধারিত অবস্থানে এইসব লিভার স্থাপন ও নিয়ন্ত্রণ করে যন্ত্রকে পরিচালনা করা যায়।
- যন্ত্রের দ্বারা ধানের চারা রোপণ করার সময় করণীয়
- নির্ধারিত প্লাটফর্মে চারা স্থাপন করতে হবে।
- ধানের চারা রোপণ যন্ত্র একবার চলতে পারে এমন জায়গা ফাঁকা রেখে জমিতে ধানের চারা রোপণ যন্ত্র চালনার জন্য স্থাপন করতে হবে।
- সমান্তরাল ভাবে যন্ত্র চালনার জন্য এর নির্দেশককে (মার্কিং পেগ) সঠিক ভাবে জমিতে স্পর্শ করে স্থাপন করতে হবে।
- এক প্রান্তের শেষে যাবার পর ইউ টার্ন নিতে হবে এবং লক্ষা রাখতে হবে যেনো সারি থেকে সারির দূরত্ব সঠিক থাকে।
- আইল অতিক্রম করার সময় যন্ত্রকে উঁচু করে নিতে হবে।
- চারা রোপণের সময় জমিতে ১-২ সে. মি. পানি থাকতে হবে।
- চারা রোপণ করার কমপক্ষে ৪৮ ঘন্টা আগে জমিতে চাষ ও মই দেওয়া সম্পন্ন করতে হবে।
- ধানের চারা রোপণ যন্ত্র চালনার সময় সমস্যা ও প্রতিকার
- সমস্যাঃ চারা রোপণ হচ্ছেনা বা কোথাও ফর্ম কোথাও বেশী চারা রোপিত হচ্ছে।
- কারণঃ চারা সমভাবে ট্রেতে নাই অর্থাৎ কোথাও ঘন বা কোথাও পাতলা আছে বা প্লাস্টিং ফর্ক সঠিক নাই।
- সমাধানঃ চারা রোপণের গতি কমাতে হবে এবং সেই সাথে ট্রান্সপ্লান্টার এর ক্রুশদিত সময়ের গতি কমাতে হবে। প্লান্টিং ফর্ক ক্ষয় হয়ে গেলে বা নষ্ট থাকলে পাল্টাতে হবে। সঠিক মাপে চারার মাটি কাটতে হবে। চারা স্থান্টিং অবস্থানে স্থাপন করবার পর অল্প পানি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে।
- সমস্যাঃ চারা প্লান্টিং ফার্কে আটকে যাচ্ছে এবং দলা বেঁধে যাচ্ছে।
- কারণঃ কাদামাটি যুক্ত বীজতলা এই সমস্যা তৈরী করতে পারে।
- সমাধানঃ চারা রোপণের গতি কমাতে হবে। ম্যাট যথাসম্ভব শুকনো রাগতে হবে। চারা রোপণের গভীরতা বাড়াতে হবে।
- সমস্যাঃ চারা ভেসে যাচ্ছে ও সোজা হয়ে রোপণ হচ্ছে না।
- কারণঃ তারা সঠিক গভীরতায় রোপিত হচ্ছেনা বা জমিতে দাড়ানো পানির পরিমাণ বেশী
- সমাধানঃ চারা রোপণের কমপক্ষে ৪৮ ঘন্টা আগে জমি তৈরী করতে হবে। জমিতে অতিরিক্ত পানি থাকলে বের করে দিতে হবে। চারা রোপণের গতি কমাতে হবে।
- সমস্যাঃ ধানের চারা রোপনের পর মারা যাচ্ছে।
- কারণঃ রোগাক্রান্ত চারা, অধিক ঠান্ডা আবহাওয়াতে চারা রোপণ ও লবণাক্ততার কারণে এমন হতে পারে
- সমাধানঃ রোগমুক্ত চারা উৎপাদন করতে হবে। অতিরিক্ত ঠান্ডা আবহাওয়া ও শৈত্য প্রবাহের সময় চারা রোপণ করা যাবে না। লবণাক্ত পরিবেশে লবণাক্ত সহনশীল জাতের ধানের চারা রোপণ করতে হবে।
- ব্যবসায়িক সম্ভাব্যতা
- একক, কয়েকজন মিলে অথবা সমবায়ের মাধ্যমে যন্ত্র ক্রয় করে ভাড়া ভিত্তিতে চালানো লাভজনক এবং গ্রামের বেকার যুবক ও যুব মহিলারা যন্ত্রটির সফল ব্যবহারের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। যন্ত্রটির ক্রয় মূল্য ৩.৫০,০০০ টাকা থেকে ৪,৫০,০০০ টাকা (মডেল ও কোম্পানি অনুযায়ী)। আমন ও বোরো এই দুই মৌসুমে ৬৪ হেক্টর জমিতে ধানের চারা রোপণ করা সম্ভব হলে পরিচালনা ব্যয় বাস দিয়ে বছরে ১,২৮,০০০ টাকা মুনাফা করা সম্ভব।
